কম খরচে সব সেবা


 কুর্মিটোলা জেনারেল হাসপাতাল
কম খরচে সব সেবা
কুর্মিটোলা জেনারেল হাসপাতাল
বাইরে থেকে দেখে বোঝার উপায় নেই যে, এটি একটি হাসপাতাল। সব শ্রেণির মানুষ শারীরিক সমস্যা নিয়ে হাজির হয় চিকিৎসকদের কাছে। চিকিৎসা প্রতিষ্ঠানটির নাম কুর্মিটোলা জেনারেল হাসপাতাল। ১০ টাকায় সব চিকিৎসা, বিশেষ খেতাব নিয়ে বিশেষ পরিচিতি রয়েছে এ সেবাকেন্দ্রের। কোন কোন সেবা এখান থেকে পাবেন, কীভাবে যাবেনÑ বিস্তারিত লিখেছেন শাওয়াল নবী উজ্জল
অবস্থান : ঢাকা সেনানিবাসের এমইএস এলাকায় আর্মড ফোর্সেস মেডিক্যাল কলেজের পাশেই অবস্থিত। হোটেল র‌্যাডিসন ব্লু গার্ডেনের ঠিক বিপরীত দিকে চোখে পড়বে চমৎকার দৃষ্টিনন্দন ভবন। কাচ দিয়ে ঘেরা এ চিকিৎসাকেন্দ্র কুর্মিটোলা জেনারেল হাসপাতাল। ২০১২ সালের ১৩ মে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা ৫০০ শয্যার ১২ তলাবিশিষ্ট এ হাসপাতালটি উদ্বোধন করেন। অত্যাধুনিক সব প্রযুক্তি ও চিকিৎসা সরঞ্জামে সুসজ্জিত এ হাসপাতালে বেশ কম খরচে চিকিৎসাসেবা পাচ্ছেন সাধারণ মানুষ।
প্রতিষ্ঠার প্রথম দিকের গল্প : কুর্মিটোলা জেনারেল হাসপাতালের পাশে অবস্থিত সুপরিচিত আর্মি মেডিক্যালের শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানÑ আর্মড ফোর্সেস মেডিক্যাল কলেজ। মূলত এ শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের শিক্ষার্থীদের ব্যবহারিক শিক্ষা বা প্র্যাকটিসের সুযোগ করে দেওয়া এবং সরকারের স্বাস্থ্যসেবার লক্ষ্য অর্জনের উদ্দেশ্য নিয়ে হাসপাতালটির যাত্রা শুরু হয়। বাংলাদেশ সরকারের সম্পূর্ণ অর্থায়নে হাসপাতালটি প্রতিষ্ঠিত হয়েছে। যদিও জায়গা সেনাবাহিনীর, সরকার জায়গাটি ৯৯ বছরের জন্য লিজ নিয়ে হাসপাতাল প্রতিষ্ঠা করেছে। ভবনটি ১২ তলা হলেও উপরের চারতলা এখনো কাজে লাগানোর অপেক্ষায় রয়েছে। পরিষ্কার-পরিচ্ছন্ন আর মনোরম পরিবেশে পরিচালিত হচ্ছে হাসপাতালটি।
জনবল : চিকিৎসা সেবাকেন্দ্রটির পরিচালনায় এখানে চিকিৎসক হিসেবে নিয়োজিত আছেন ১০২ জন। সার্বিক তদারকি ও রক্ষণাবেক্ষণে দায়িত্ব পালন করছেন ৭৭ জন নার্স। শিক্ষানবিশ বা ইন্টার্নি চিকিৎসক ও জুনিয়র নার্সরা সেবার কাজে ভূমিকা রাখছেন। ৫০০ বেডবিশিষ্ট এ হাসপাতালে বিশেষ রোগীদের জন্যও রয়েছে ১২টি কেবিনের ব্যবস্থা। প্রতিষ্ঠানটির যাত্রাপরবর্তী সময়ে রোগীর ভিড় খুব বেশি না থাকলেও এখন তা কয়েক গুণ বেড়েছে। পরিচালক ব্রিগেডিয়ার জেনারেল খোন্দকার শহিদুল গণির দাবি, ৪০ শতাংশ জনবল দিয়ে এখানে সেবা কার্যক্রম চলছে। কষ্ট করে হলেও চিকিৎসকরা তাদের দায়িত্ব পালন করছেন। ৯৬৬ জনের অনুমোদন থাকলেও আপাতত ৩৯৬ জন দিয়ে প্রতিষ্ঠানটির সব ধরনের কার্যক্রম পরিচালিত হচ্ছে বলেও জানান এ কর্মকর্তা।
যেসব সেবা পাওয়া যাবে : হাসপাতালের বহির্বিভাগে প্রতিদিন আড়াই হাজারের বেশি রোগী দেখা হয়। ১০ টাকা দিয়ে টিকিট কেটে রোগী দেখানো যায়। সকাল ৮টা থেকে দুপুর আড়াইটা পর্যন্ত বহির্বিভাগে রোগী দেখা হয় বলে জানান প্রতিষ্ঠানটির পরিচালক ব্রিগেডিয়ার জেনারেল শহিদুল গণি। জরুরি বিভাগ থেকে শুরু করে হাসপাতালটিতে মেডিসিন, অর্থোপেডিকস, গাইনি অ্যান্ড অবস, চর্ম ও যৌন, নাক-কান-গলা, চক্ষু ও ডেন্টাল বিভাগ চালু আছে। পাশাপাশি বার্ন ইউনিট, সোয়াইন ফু ও ইবোলা ইউনিটও খোলা হয়েছে। আর চালু হওয়ার অপোয় নিউরো সার্জারি, কার্ডিয়াক সার্জারি, ইউরোলজি, নিউরোলজি, নেফ্রোলজি, ফিজিক্যাল মেডিসিন, এনআইসিইউ। পরিচালক ব্রিগেডিয়ার জেনারেল খোন্দকার শহিদুল গণি জানান, সরকার সংশ্লিষ্টদের সঙ্গে আলোচনা চলছে, শিগগিরই বিভাগগুলো চালু করতে আমরা উদ্যোগ নিচ্ছি। এ হাসপাতাল নতুন হলেও এখানকার রোগীরা কিন্তু অন্যান্য পুরনো বিশেষায়িত চিকিৎসাপ্রতিষ্ঠানগুলোর মতোই সেবা পাচ্ছেন।
খরচাপাতি : এ চিকিৎসাপ্রতিষ্ঠানটির প্রথম দিকের পরিচয় এসেছে মূলত ১০ টাকায় বিশেষ সেবা নাম দিয়ে। গল্পের ছলে পরিচালক ব্রিগেডিয়ার জেনারেল খোন্দকার শহিদুল গণি বলছিলেন, খুব কম খরচে রোগীরা এখান থেকে সবচেয়ে ভালো সেবাটাই পাচ্ছেন। অন্যান্য সরকারি হাসপাতালে যে সেবা দেওয়া হয় সেটিই আমরা দিচ্ছি, তবে এখানকার সেবার মান পুরোপুরি জনবান্ধব। কুর্মিটোলা জেনারেল হাসপাতাল থেকে সেবা পেতে চাইলে মাত্র ১০ টাকায় টিকিট কাটতে হবে আর ভর্তি হতে চাইলে দরকার পড়বে ১৫ টাকা। অন্যদিকে টেস্ট বা অন্যান্য সেবা ব্যয়ও তুলনামূলকভাবে বেশ কম। টেস্টের মধ্যে এক্স-রে ৭০ টাকা, ইউরিন ২০, ইসিজি ৮০, ইসিটি ৬০০ ও টিসি-ডিসিতে খরচ লাগবে ১৫০ টাকা। আল্ট্রাসনোগ্রাম ১১০ টাকায় সিঙ্গেল আর ডাবল ২২০ টাকা, অ্যাবডোমিনাল এনজিও গ্রাম ১ হাজার ৫০০, সিটি স্ক্যান ব্রেইন ২ হাজার, কিডনি বায়োপসি ৫০০ আর হোমোডায়ালাইসিস করতে খরচ লাগবে ২০০ থেকে ৩০০ টাকা। রেডিওথেরাপিতে ৫০ থেকে ৭০ টাকা, এমআরআই ৩ হাজার ৪ হাজার, ব্লাড কালচারে নেবে ২০০ টাকা। পরিচালক জানান, সিটি স্ক্যান, এমআর, ওপিজি, মেমোগ্রাফি, ফোর ডি আল্ট্রাসনোগ্রাফি, ফোরডি ইকো মেশিন, এনডোসকপিসহ অন্যান্য পরীক্ষা-নিরীক্ষিায় সবচেয়ে আধুনিক এবং সরকারি খরচে সামান্য ব্যয়ে কুর্মিটোলা থেকে রোগীরা সেবা পাচ্ছেন।
সেবা নিয়ে ভোক্তাদের বক্তব্য : সিরাজগঞ্জ থেকে চিকিৎসা নিতে আসা আবুল হোসেন বলেন, এ হাসপাতালের চিকিৎসার মান বেশ ভালো। চিকিৎসকরা বেশ আন্তরিক। এখানে চিকিৎসা করিয়ে সন্তুষ্টির কথাই জানালেন আরেক রোগী নুর আলম। তিনি এসেছেন গাজীপুরের টঙ্গী থেকে, পরিবেশ নিয়ে সন্তুষ্টির কথা জানালেন। তার বক্তব্য, এখানে কম খরচে চিকিৎসা করা যায়। হাসপাতালের পরিবেশও বেশ সুন্দর। অন্যান্য সরকারি হাসপাতালের মতো নয়। এ জন্য এখানে এসে ভালো লাগছে।
অন্যান্য সেবা : এখানে ব্যাংকিং সেবা, ক্যাফেটেরিয়া, ফার্মেসির ব্যবস্থাও রাখা আছে। হাসপাতালের সামনে রয়েছে পার্কিংয়ের ব্যবস্থা। ৩০০ টাকায় সিটি করপোরেশন ও ২০০ টাকায় পৌরসভার মধ্যে অ্যাম্বুলেন্স ভাড়া নেওয়া যাবে।
কীভাবে যাবেন : রাজধানীর ক্যান্টনমেন্ট, মিরপুর, বাড্ডা, খিলতে, উত্তরা, সাভার, টঙ্গী বা গাজীপুর এলাকা থেকে এখানে আসা বেশ সহজ। অন্যান্য এলাকা থেকে আসতে চাইলে হোটেল র‌্যাডিসনের সামনে এমইএস নামতে হবে। এপথে সব এলাকা থেকে যাতায়াত করা বাস সার্ভিস রয়েছে। তাছাড়া সিএনজিচালিত অটোরিকশা নিয়েও আসা যাবে এ হাসপাতালে।

একটি মন্তব্য পোস্ট করুন

0 মন্তব্যসমূহ